ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। সফরের শেষ দিনে বেইজিংয়ের তিয়াওইউথাই হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সুবিধা এবং নতুন প্রযুক্তির সহযোগিতা প্রসারে এই চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা
সফরের দ্বিতীয় দিনে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের মধ্যে এক ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আধুনিকায়নে একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে যৌথ অঙ্গীকার করা হয়। বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সমঝোতা স্মারকগুলোতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি বিশেষ চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।আর একটা এমওইউ হয়েছে পলিটিক্যাল পার্টি টু পলিটিক্যাল পার্টি। অর্থাৎ বিএনপি বাংলাদেশের বর্তমানে যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে এবং চীনের ক্ষমতাধর যে রাজনৈতিক দল রয়েছে চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির সাথে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। পরদিন সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা সেরে তিনি পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়। বৃহস্পতিবার গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তার ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর লি ছিয়াংয়ের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সফরের শেষ দিন শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও একান্ত বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধান প্রধান সমঝোতা ও অর্জনের দিকসমূহ
স্বাক্ষরিত ১৭টি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা: বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের আধুনিকায়ন এবং শিল্পাঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। জিডিআই অংশীদারত্ব: চীনের প্রস্তাবিত ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়া। অন্যান্য খাত: মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, চীনের ভাষা শিক্ষা এবং গণমাধ্যম খাতে পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধি।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক
সফরের শেষ দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক বিশেষ দ্বিপক্ষীয় ও একান্ত বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে দুই নেতা একযোগে ঘোষণা করেন যে, নতুন যুগে চীন ও বাংলাদেশ একটি 'শেয়ার্ড ফিউচার' বা অভিন্ন ভাগ্যের অংশীদারিত্বের কমিউনিটি গড়ে তুলবে, যার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে দেশের চলমান উন্নয়নযাত্রায় পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের নতুন সরকারের শাসনতান্ত্রিক প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, বেইজিং সবসময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটের যেকোনো পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও চীনের এই নীতি অপরিবর্তিত থাকবে। বাংলাদেশকে একটি বিশ্বস্ত বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আশ্বস্ত করেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানের পাশে থাকবে চীন।একই সাথে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা, গ্রিন ও লো-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল ইকোনমি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্ভাবনা উন্মোচনের প্রত্যয় জানান। এছাড়া আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও তিনি জোর দেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিপিসির ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের স্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান 'এক-চীন নীতি'র প্রতি বাংলাদেশের অনড় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাংলাদেশ যেকোনো ধরনের তাইওয়ানের স্বাধীনতা'র দাবির তীব্র বিরোধিতা করে। একই সাথে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সংক্ষিপ্ত তবে অত্যন্ত কার্যকর চীন সফর ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যকার রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন যুগে প্রবেশ করালো।
Raoha
BCYSA.ORG এর নিউজ-এ আপনিও লিখতে পারেন। গণচীনে প্রবাস জীবনে আপনার অভিজ্ঞতা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খবরাখবর, আনন্দ-বেদনার গল্প, স্মৃতিচারণ, ভ্রমণ, অনুভূতি, বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর ছবিসহ আমাদের (বাংলা অথবা ইংরেজিতে) পাঠাতে পারেন। লেখা পাঠানোর ইমেইল : [email protected]।